ওয়েব ডেস্ক: জ্বালানি তেলে প্রায় এক যুগ ধরে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না। ২০১৪ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হওয়ার পর এ খাতে আর ভর্তুকি দিতে হয়নি। এরপর ১১ বছরের মধ্যে একবার লোকসান করেছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এরপরও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। এমনকি বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীল হলেও এ খাতে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়নি।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, জ্বালানি তেলের আমদানি মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রয় মূল্য সামঞ্জস্য না থাকার কারণে বিপিসিকে ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত ক্রমাগত লোকসানের মুখোমুখি হতে হয়, যার মোট পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এ লোকসানের বিপরীতে সরকার ওই সময় বিপিসিকে মোট ৪৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়।
এরপর থেকে বিপিসি মুনাফা শুরু করে। এতে ১০ বছরে সংস্থাটি ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। তবে মুনাফার বড় অংশই সরকারি তহবিলে জমা দিতে হয়। এভাবে এক দশকে বিপিসির মুনাফার ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে চলে গেছে। বাকি অর্থ বিপিসি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এফডিআর করে রাখে, যার বড় অংশ গত ছয় মাসে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিপিসির তথ্যমতে, বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসি লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুন মাসে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। তাই আমদানির ব্যয়ের ঘাটতি মেটানোর জন্য বিপিসি এরই মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এফডিআর হিসেবে রাখা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে ব্যয় করেছে।
ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের কাছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ভর্তুকি চেয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর চিঠি দেয় বিপিসি। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম সংস্থাটির বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন এবং এই চাপ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান। যদিও তাতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ভর্তুকি কমানোর জন্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের বলেন, ২০ টাকা দাম বাড়িয়েও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারকে ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী ২০৫ টাকা দরের ডিজেল ১৩৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দাম বাড়ানোর পরও ডিজেলে বছরে লোকসান হতে পারে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য জ্বালানি তেলে এ ভর্তুকি বাড়বে ১০ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ২২ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি দেশে জ্বালানি খাতেও সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। এ কারণে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনগণের কষ্ট হচ্ছে। জনগণের কাছে সহনশীলতা চাই। কারণ কত ভর্তুকি সরকারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব?’
প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হলে বছরে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলেও জানান তিনি। যদিও এ পর্যন্ত বর্তমান সরকার জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকিই দেয়নি। উল্টো এ খাতে আগের মতোই উচ্চহারে শুল্ককর আদায় করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, বর্তমানে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনে ৩১ দশমিক ৮৫ শতাংশ শুল্ককর আদায় করা হয়। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ২ শতাংশ ও অগ্রিম কর (এটি) সাড়ে ৭ শতাংশ। এছাড়া বিতরণ পর্যায়েও রয়েছে পৃথক ২ দশমিক ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ইনভয়েস ভ্যালুতে বকেয়া শুল্ক লিটারে ১ টাকা।
অন্যান্য জ্বালানি তেলে শুল্ক-কর আরও বেশি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলে শুল্ককর ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং অন্যান্য জ্বালানিতে ৬১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বিপিসির তথ্যমতে, ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে জ্বালানির দামে কিছুটা স্বস্তি দিতে শুল্ককর কমানো হয়েছিল। সে সময় শুধু ডিজেল আমদানির ওপর শুল্ককর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছিল।
২০২২ সালের ২৮ আগস্ট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। এছাড়া অগ্রিম কর ৫ শতাংশ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। ফলে ডিজেল আমদানির ওপর মোট করভার ৩৪ শতাংশ থেকে কমে ২২ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ করভার ১১ দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস পায়। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর এ সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বিপিসির আমদানি ব্যয় হ্রাস পেয়ে লোকসান কমে আসে।
এবারও জ্বালানি তেলে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বিপিসি। সংস্থটির চেয়ারম্যান গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগকে চিঠিতে জানায়, গত ছয় মাসে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসানের হিসাব দেওয়া হয়। লোকসানের অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছে বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে। আর এই লোকসানের অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিসহ এনবিআরের শুল্ক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনের আগে এনবিআর ট্যারিফ ভ্যালুতে প্রতি লিটারে আমদানি শুল্ক নিত ১৬ দশমিক ৭৬ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ইনভয়েস ভ্যালুর ওপর। অর্থাৎ দাম বাড়লে এনবিআর বেশি করে শুল্ক পাবে। এই হিসাবে যুদ্ধের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার তেলে এনবিআর শুল্ক নিয়েছে ১৮ দশমিক ৩৬ টাকা। যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চে আমদানি শুল্ক নেওয়া হয় প্রতি লিটারে ৩৮ দশমিক ৬৪ টাকা, এপ্রিলে ৩৮ দশমিক ৯০ টাকা, জুলাইতে ২৯ দশমিক ৭৪ টাকা (ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পর) এবং আগস্টে ৩২ দশমিক ৪৪ টাকা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, চলতি মাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের বেশি। তাই এখন প্রতি লিটার তেলের শুল্ক দিতে হবে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। ডিজেলের এখন ব্যাপক ঘাটতি হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে তেলের দাম বৃদ্ধি বা ২২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান অথবা ইরান যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তেলের আমদানি শুল্ক কমানো দরকার।
যদিও সরকার শুল্কে হাত না দিয়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল এবং কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।